গ্রীষ্মে উপকারি ফল আম

Posted on

এখন বাজারে গেলেই চোখ পড়বে স্তুপাকার সব আমের দিকে। আমের ঘ্রাণে ম ম করছে চারিদিক। বাংলাদেশে বছরের এই সময়টাতে প্রত্যেক ঘরেই সুস্বাদু রসালো আম খাওয়ার ঢল পড়ে যায়। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতেও উপহার হিসেবে পাঠানোর ক্ষেত্রে ভালো মানের আমের জুড়ি নেই।

আম ভারতীয় উপমহাদেশীয় এক প্রকার সুস্বাদু ফল। শুধু একটি নয়, তিনটি দেশের জাতীয় ফল আম। ভারত, পাকিস্তান আর ফিলিপাইনে আমকে জাতীয় ফলের উপাধি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে আম হলো ফলের রাজা এবং আম গাছকে বলা হয় জাতীয় গাছ। স্বাদে, গন্ধে আম সবার মনে সুস্বাদু এক ফল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। আমের তুলনা আম নিজেই। পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ প্রজাতির আম আছে। যেমন: ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসা, অরুনা, আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্নরেখা, মিশ্রিদানা, নিলাম্বরী, কালীভোগ, কাঁচামিঠা, আলফানসো, বারোমাসি, তোতাপূরী, কারাবাউ, কেঊই সাউই, গোপাল খাস, কেন্ট, সূর্যপূরী, পাহুতান, ত্রিফলা, হাড়িভাঙ্গা, ছাতাপরা, গুঠলি, লখনা, আদাইরা, কলাবতী ইত্যাদি। ভারতের মালদহ , মুর্শিদাবাদ-এ প্রচুর পরিমাণে আম চাষ হয়ে থাকে। বাংলাদেশের রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম চাষ বেশি পরিমাণে হয়ে থাকে। আমের বিভিন্ন জাত আছে।

‘ম্যাঙ্গো’ শব্দটির উৎপত্তি হয় ভারতে। ইংরেজিতে ম্যাঙ্গো শব্দটি সম্ভবত তামিল ‘ম্যানকেই’ কিংবা তামিল ‘মানগা’ শব্দ থেকে এসেছে। যখন পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করে, তারা নাম হিসেবে ‘ম্যাংগা’ শব্দটি গ্রহণ করে। আর যখন ব্রিটিশরা ১৫শ এবং ১৬শ শতকের দিকে ভারতে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে ব্যবসা শুরু করে, তখন ‘ম্যাঙ্গো’ শব্দটির জন্ম। হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে ভারত এবং মিয়ানমারে প্রথম বন্য আম উৎপন্ন হয় বলে মনে করা হয়। পাঁচ হাজার বছর আগে প্রথম আমের চাষ করা হয় ভারতের দক্ষিণ অংশ, মিয়ানমার এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে (বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপপুঞ্জ)।

পুরো পৃথিবী জুড়েই আম পাওয়া যায়। সুপারমার্কেটগুলো বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চল থেকেই আম সংগ্রহ করে থাকে। বছরের শুরুর দিকে আম আসে পেরু থেকে, এরপর পশ্চিম আফ্রিকা আর তারপর আসে ইসরায়েল থেকে। মিশর থেকে আম আসে বছরের তৃতীয় ভাগে আর তারপর আমের উৎস হলো ব্রাজিল। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আম উৎপন্ন হয় ভারতে।

প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ৪৬ মিলিয়ন টন আম উৎপন্ন হয়। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত উষ্ণ প্রধান জলবায়ুর অঞ্চল গুলিতে আমের চাষাবাদ হয়। এর মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি আম উৎপাদন হয় শুধুমাত্র ভারতেই। এর পর অন্যান্য যেসব দেশ আম উৎপাদন করে তার মধ্যে আছে চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর-দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ-পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা প্রভৃতি।

বাংলাদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আমের জন্য বিখ্যাত। “কানসাট আম বাজার” বাংলাদেশ তথা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ আম বাজার হিসেবে পরিচিত। মকিমপুর, চককির্ত্তী, লসিপুর, জালিবাগান, খানাবাগান সহ বিশেষ কিছু জায়গায় অত্যান্ত সুস্বাদু এবং চাহিদা সম্পুর্ণ আম পাওয়া যায়।

আম খুবই উপকারী ফল। আয়ুর্বেদ ও ইউনানি পদ্ধতির চিকিৎসায় পাকা ফল ল্যাকজেটিভ, রোচক ও টনিক বা বলকারকরূপে ব্যবহৃত হয়। রাতকানা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে পাকা আম এমনকি কাঁচা আম মহৌষধ। কচি পাতার রস দাঁতের ব্যাথা উপশমকারী। জ্বর, বুকের ব্যথা, বহুমূত্র রোগের জন্য আমের পাতার চূর্ণ ব্যবহৃত হয়। আম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

স্বাদে, পুষ্টিতে ও গন্ধে আম অতুলনীয়। তাই আমকে বলা হয় ফলের রাজা। আম পছন্দ করে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। আমে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ বা ক্যারোটিন, ভিটামিন ‘সি’, খনিজ পদার্থ ও ক্যালরি রয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ এর দিক থেকে আমের স্থান পৃথিবীর প্রায় সব ফলেরই উপরে। তাই বিশ্বজুড়ে এর কদরও বেশ চোখে লাগার মতো।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments