ঘুম বা নিদ্রা হচ্ছে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি এমন একটি সময় যখন মানুষ আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে অবচেতন থাকে। সকল স্তন্যপায়ী ও পাখি এবং বহু সরীসৃপ, উভচর এবং মাছের মধ্যে ঘুমানোর প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী এবং অন্য বেশ কিছু প্রাণীর ( যেমন: কিছু প্রজাতির মাছ, পাখি, পিঁপড়া এবং ফ্রুটফ্লাই) অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নিয়মিত ঘুম আবশ্যক।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন বলছে বয়স অনুযায়ী মানুষের ঘুমের সময়টাও ভিন্ন হবে। রুটিন না মেনে চলা, অ্যালকোহল বা উত্তেজক কিছু সেবন যেমন : কফি বা কোনো এনার্জি ড্রিঙ্ক, এলার্ম ঘড়ি বা দিনের আলো এমন সব কিছুই প্রাত্যহিক জীবন চক্রকে বাধাগ্রস্ত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন বা এনএসএফ বলছে, প্রত্যেকের লাইফ স্টাইলই আসলে তার ঘুমের চাহিদা বুঝতে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু বয়স অনুসারে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে পরামর্শ ও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এনএসএফ’র ঘুম বিশেষজ্ঞরা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে করণীয় সম্পর্কে একটা তালিকাও প্রকাশ করেছেন।

নবজাত শিশু : (৩ মাস পর্যন্ত) ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা। যদিও ১১ থেকে ১৩ ঘণ্টাও যথেষ্ট হতে পারে। তবে কোন ভাবেই ১৯ ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়।

• শিশু (৪ থেকে ১১ মাস) : কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা আর সর্বোচ্চ ১৮ ঘণ্টা।

• শিশু (১/২ বছর বয়স):১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা

• প্রাক স্কুল পর্ব (৩-৫ বছর বয়স): বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা।

• স্কুল পর্যায় ( ৬-১৩ বছর) : এনএসএফ’র পরামর্শ ৯-১০ ঘণ্টার ঘুম

• টিন এজ (১৪-১৭ বছর): ৮-১০ ঘণ্টার ঘুম প্রয়োজন।

• প্রাপ্ত বয়স্ক তরুণ (১৮-২৫ বছর): ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত।

• প্রাপ্ত বয়স্ক (২৬-৬৪ বছর): প্রাপ্ত বয়স্ক তরুণদের মতোই।

• অন্য বয়স্ক ( ৬৫ বা তার বেশি বছর): ৭/৮ ঘণ্টার ঘুম আদর্শ। কিন্তু ৫ ঘণ্টার কম বা ৯ ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়।

ভালো ঘুম অনেকেরই হয় না৷ কখনো বা সারারাত নির্ঘুম কেটে শেষ রাতে চোখে ঘুম নেমে আসে। এভাবে এক আধ রাত ঘুম না এলে দুশ্চিন্তাও বাড়তে থাকে। ফলে পরদিন ক্লান্তি অনুভূত হয়। এভাবে ঘুম না আসাকে ইনসোমিয়া বা অনিদ্রা বলে। মস্তিষ্কের নিউরো হরমোনাল অসামঞ্জস্য এর অন্যতম কারণ। অনিদ্রার ফলে কর্মক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা ও মনোযোগ কমে যেতে পারে। শারীরিক ক্ষতিও হতে পারে। ওজনাধিক্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া এমন আরও অনেক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অনেকের রাতে অনেকবার ঘুম ভেঙে যায়। তাহলে ভালো ঘুমের চাবিকাঠি কি? বিছানায় শোয়ার মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘুম আসার একটি অত্যন্ত সহজ উপায় আছে। এটি একটি বিশেষ শ্বাসক্রিয়ার অভ্যাস। এই অভ্যাসের পোশাকি নাম হলো ‘৪–৭–৮’। সহজে ঘুম আনার পথটি বাতলে দিয়েছেন লেখক ডক্টর অ্যান্ড্র ওয়েইল। লেখক জানিয়েছেন, প্রথমে নাক দিয়ে চার সেকেন্ড শ্বাস নিন। তারপর সাত সেকেন্ড শ্বাসক্রিয়া আটকে রাখুন। আর আগামী আট সেকেন্ড আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন। যতক্ষণ পর্যন্ত ঘুম না আসে এভাবেই শ্বাসক্রিয়া চালান। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়বেন। লেখকের মতে এরফলে হৃদপিন্ডে কেমিক্যালের প্রভাব কমে যায়। মন আর মস্তিষ্ক শান্ত হয়। তাই চটজলদি ঘুম এসে যায়।

দৈনন্দিন জীবনে কর্মক্ষম থাকতে ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নিচের টিপসগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ঘুমের জন্য।

• ঘুমের নির্ধারিত সময় মেনে চলা
• নিয়মিত ব্যায়াম
• বেডরুমের আদর্শ তাপমাত্রা, সাউন্ড ও লাইট
• আরামদায়ক বিছানা ও বালিশ
• অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন না নেওয়া
• শয্যায় যাওয়ার আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করা

এছাড়াও ঘুম না আসার কারণ খুঁজে বের করা, ঘুমানোর আগে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার না করা, বিছানায় শুয়ে বসে কাজ করা থেকে বিরত থাকা, দুশ্চিন্তা না করা সহ অন্যান্য ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে ঘুমের সময় নিয়মিত হবে এবং ভালো ঘুম হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে